শনিবার, ১৩ মে, ২০২৩

ইলেকশন টানছে না ভোটারদের

ইলেকশন টানছে না ভোটারদের

গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র হয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। সে টাইম সাইডে ছিলেন দলীয় নেতাকর্মীরা। পেয়েছিলেন প্রশাসনের সহযোগিতাও। অথচ এবারের নির্বাচনে কারেন্সির উল্টা পিঠ দেখছেন তিনি। ক্ষমা পাওয়ার পর আশা জেগেছিল নৌকা পাওয়ার। কিন্তু গণেশ উল্টে যায়। পরে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করতে গিয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। এমন আশঙ্কা থেকেই তার মা জায়েদা খাতুনের নামেও মনোনয়নপত্র তুলেছিলেন। এখন মাকে নিয়েই উনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। জায়েদা খাতুনের টেবিল ঘড়ি মার্কা নিয়ে তিনি নির্বাচনী ময়দানে। অথচ গত ইলেকশনের মতো দলীয় নেতাকর্মীরা তার সাথে নেই।

আগামী ২৫শে মে নির্বাচন। জাহাঙ্গীর আলম তার মায়ের সর্বশ্রেষ্ঠ নির্বাচনী সমন্বয়ক। আবার গাজীপুর সিটি করপোরেশন ইলেকশনে আওয়ামী লীগ থেকে নৌকার মাঝি হয়ে গেছেন আজমত উল্লা খান। বিএনপি হতে দেয়া হয়নি কোনো প্রার্থী। নির্বাচনে মেয়র হওয়ার দৌড়ে আরও রয়েছেন জাতীয় পার্টির এমএম নিয়াজ উদ্দিন (লাঙল) জাকের পার্টির রাজু আহমেদ (গোলাপ ফুল), স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ নুর ইসলাম রনি রাষ্ট্রশাসক বিভাগ (হাতি), হারুন অর রশিদ লড়ছেন ঘোড়া প্রতীক নিয়ে।

শুক্রবার সকাল বেলা ১০টা। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার টঙ্গী দিয়ে এগুচ্ছে বাস। সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। রাস্তায় খোঁড়াখুঁড়ি। ক’দিন বাদে নির্বাচন। অথচ পরিবেশ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। ব্যানার, পোস্টার আখিতে পড়লো গুটি কয়েক। শুক্রবার হওয়ায় কিছুটা ফাঁকা এলাকা। বাস থেকে নেমেও আখিতে পড়লো না ইলেকশনের তেমন আলামত। গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার বোর্ড বাজার। পুরো গাজীপুর সিটির মতোই কারখানার আধিপত্য। বেশির ভাগ বাসিন্দাই এলাকার ভোটদাতা নন। এলাকার রাস্তা ধরে এগুলেও নেই পোস্টার, ব্যানারের ছোয়া। কিন্তু কয়েক কাউন্সিলরের পোস্টার ঝুলছে রাস্তায়। ভোটারদের মাঝে আলোচনা, আগ্রহ তেমনটা না থাকলেও নেতাকর্মীদের মাঝে নির্বাচন নিয়ে ছক কষছেন সবাই। নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম ও তার মা জায়েদা খাতুন।

এলাকাবাসীর ভাবনা: চায়ের দোকানগুলোতেও সেই অর্থে নেই ইলেকশনের আলোচনা। উৎসাহ দেখা যায়নি নিউ ভোটারদের মাঝেও। বোর্ড বাজার অঞ্চলে প্রভাতে চায়ের কাপে আশ্রম দিচ্ছিলেন এলাকার প্রবীণ অধিবাসী ক’জন। জানতে চাইলে তারা বলেন, ভোট নিয়ে মাথাব্যথা নাই। তবে ইচ্ছা বিদ্যমান ইলেকশন দেওয়ার জন্য যাবো। প্রাক্তন ওস্তাদ আসগর আলী বলেন, আমার এই এরিয়ায় জন্ম। সেই হিসেবে ৭৪ বছর ধরে অঞ্চলে থাকি। মেয়র আসে মেয়র যায়, রাস্তাঘাট করে। কেউ বহু করে কেউ কম। আমরা খুঁজি মন্দের ভালো। আমার এরিয়ায় কোনো একটা বাসা যদি কেউ করে মিষ্টি খাওয়ার জন্য টাকা দেয়া লাগে। এক তালা থাকার জায়গা দুই তালা করলে মিস্টি খাওয়ান লাগে। কথার সঙ্গে একমত পোষণ করলেন অন্যরাও। মো. আলী আরেক প্রবীণ ভোটার বলেন, এটি এলাকার নিয়ম হয়ে দাঁড়াইছে। তিনি বলেন, সম্প্রতি আমাদের চাই ভোটের পরিবেশ। এই যে দুই সপ্তাহ পর নির্বাচন কারও কোনো মাথাব্যথা নাই। কেন নাই এটা হলো কথা। এই আলোচনায় যোগ দিলেন চা দোকানদার মো. সৌমিক। দোকানের সামনের রাস্তা দেখিয়ে বলেন, এই রাস্তা কাঁচা আছিল। বৃষ্টি হইলে হাঁটা যায় না। এই রাস্তা করছে মেয়র জাহাঙ্গীর।

বেলা গড়িয়ে দুপুর। শুক্রবার হওয়ায় কর্মব্যস্ততা কম। ডেগেরচালা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজ শেষে অনেকেই আড্ডায় বসলেন চায়ের দোকানগুলোতে। আলোচনা চলছিল ভিন্ন বিষয়ে। হঠাৎই এক কাউন্সিলরের লিফলেট হাতে নিয়ে এলেন একজন। সেই হতে আরম্ভ হচ্ছে নির্বাচনের আলোচনা। তারা হিসেব কষছিলেন কোন এলাকায় কোন মেয়রপ্রার্থী বেশি ইলেকশন পাবেন। জানতে চাইলে আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমার মার্কা নৌকা। আজমত উল্লা খান দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। তাকে দল মনোনয়ন দিয়েছে নিশ্চয়ই অনেক ভালো বুঝেই। প্রাক্তন মেয়র জাহাঙ্গীর উন্নয়ন করেছে। সেতো আর নিজের টাকায় করে নাই। নিউ যে মেয়র হবে সেও করবে। প্রকৃতপক্ষে উন্নতি করতেছে শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেন, ভোটের মাঠে জাহাঙ্গীর সাহেবের প্রচুর ইলেকশন আছে। উনি যেহেতু মাকে দাঁড় করিয়েছেন তার ইলেকশন কয়েকটি পাবে। অথচ এটা ভুলে গেলে চলবে না জাহাঙ্গীর মেয়র তা সত্ত্বেও হয়ে গিয়ে ছিল নৌকা মার্কা নিয়ে।

আবার তার সাইডে থাকা আশিকুর রহমান বলেন, জাহাঙ্গীর এলাকার যে উন্নতি করছে তা গাজীপুরে কেউ আগে করে নাই। বাসনা ছিল বলেই তো করছে। ইদানিং তার মা যেহেতু প্রার্থী হয়েছে আমরা চাইবো আবার মেয়র সেই বাড়ি থেকেই হোক। উন্নয়ন হোক। আজমত উল্লা বেশ ভালো ব্যক্তি ও যোগ্য নেতা। আমরা আশাবাদী তিনিও গাজীপুরবাসীর জন্য উন্নতি করবেন।

সিটি করপোরেশনের আওতাধীন মালেকের বাড়ি, ড্যাগের চালা, হাজিরপুকুর, বাইপাশ, কুমারঝুরি ও হারিকেন এই এলাকাগুলোতে একাধিক ভোটারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রান্তিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত ভোট আছে জাহাঙ্গীরের। সম্প্রতি যেহেতু মাঠে বিএনপি প্রার্থী নেই সেহেতু নৌকা বিরোধী ভোটগুলো কোন দিকে যায় সেটাও দেখার বিষয়। অধিকাংশই বলছেন, সুষ্ঠু ইলেকশন হলে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। গতকাল সারাদিনে মেয়র প্রার্থীদের কোনো প্রচার নয়নে না পড়লেও একাধিক কাউন্সিলর প্রার্থীর মাইকিং কানে আসে।

উৎসাহ নেই নিউ ভোটারদের: বোর্ড বাজার এরিয়া হতে সাইনবোর্ড। নেই পোস্টার। নাই কোনো নির্বাচনী প্রচারণা। এই এলাকার একটি সড়ক ধরে ছোট একটা বাজার। ওখান আখড়া দিচ্ছিলেন কয়েকজন যুবক। যাদের অধিকাংশই প্রথম ভোটার। তাদের এক উত্তর, কোনো বিশেষ প্রবৃত্তি নাই। একজনতো বলেই বসলেন, কবে ইলেকশন তাই জানি না। ভোট দিলে দিতেও পারি। সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের ছাত্র আহমেদ সাদ বলেন, ১ম ভোটার, ইলেকশন দেবো। এটা বয়স হবার পর প্রথম বখশিশ বলতে পারেন। অথচ আমি যে ইলেকশন দেবো তা নিয়ে কোনো আগ্রহ পাচ্ছি না। ভোট নিয়ে গত বছরের যে পরিবেশ তা বিবেচনা করে ভোট নিয়ে মাথাব্যথা নেই। আবার প্রশ্নও ওঠে আমার ভোটের আদৌও কি কোনো প্রয়োজন আছে?

আলোচনায় নেই বিএনপি: ভোটারদের সাথে দীর্ঘ আলোচনায় কোথায় যেন অনুপস্থিত রাষ্ট্রের বড় অন্যটি দল বিএনপি’র নাম। বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্তে প্রার্থী না দিলেও মেয়র হবার দৌড়ে পায়ে শান দিচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন রাষ্ট্রের ভাতিজা স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহানুর রহমান রনি। এই এলাকাগুলো ঘুরে বিএনপির এক সমর্থক বলেন, এরিয়ায় আমাদের অবস্থা এরূপ হয়ে গিয়েছে যে চুপ থাকা শ্রেয়। কোনো আলোচনায় আমাদের নাম সত্যি যেন বিপদ। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিএনপির কোনো কার্যক্রমে যোগ দেই নাই। আবার এবারের ইলেকশনে যেহেতু বিএনপির কোনো প্রাথী নাই তাই কোনো আগ্রহও নাই। তিনি বলেন, বিএনপি’র একটা বিশাল ভোটতো আছেই। তবুও দেশের সিচুয়েশনে আমরা ইলেকশন দিতে পারবো কিনা, সেই ইলেকশন আদৌও পরিমাপ হবে কিনা তা নিয়ে ডর আছে।

চাঁদাবাজি থেকে খালাস চান এলাকাবাসী: শিল্প কলকারখানানির্ভর গাজীপুর রাষ্ট্রের বৃৃহত্তম সিটি করপোরেশন। জবের সুবাদে অধিকাংশই বাসস্থান গড়েছেন এই এলাকায়। প্রায় ২৭ বছর ধরে হারিকেন এরিয়ায় থাকেন মো. আব্দুল্লাহ। জমি কিনে থাকার জায়গা করেছেন তিনি প্রায় এক যুগ আগে। তিনি বলেন, আমার বাড়ির পিছনের একটা সড়ক পাকা করার জন্য আমরা একাধিকবার আগের মেয়র ও সংসদ সদসস্যের কাছে দাবি জানাই। অথচ জাহাঙ্গীর এই রাস্তা করেছেন। আমরা প্রয়োজন যেই ক্ষমতায় আসুক উন্নয়ন হোক। কিছু পথের কাজ ও ড্রেনেজের কাজ বাকি বিদ্যমান সেগুলোও ঠিকমতো করা হোক। উন্নয়ন হলেও, এই এলাকায় কোনো বাসা বানালে এক তালা হতে দোতালা করলেই মিষ্টি খাওয়ার টাকা দেওয়ার জন্য হয়। ব্যবসা করলেও চলে আসে তারা। আমরা নতুন মেয়রের নিকট এই মিষ্টি খাওয়ার নামের চাঁদাবাজি হতে অব্যাহতি চাই।

আহমেদ নুর নামে কুড়িগ্রামের ভোটার, গাজীপুরের বাসিন্দা বলেন, আমি গাজীপুরে থাকি প্রায় ২৫ বছর। প্রথমে এলাকায় মারামারি, সহিংসতা ছিল যা এখন অনেক কম। তবে আজকাল বাড়ি গঠন বা ব্যবসা পরিচালনায় চাঁদাবাজি আছে। নতুন মেয়রের কাছে ব্যাকুল আবেদন থাকবে যাতে এই চাঁদাবাজি না হয়।

জাহাঙ্গীরের বাসার চিত্র: সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর অর্থাৎ জায়েদা খাতুনের বাসা মূল সড়কের পাশেই ড্যাগের চালা এলাকায়। বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, গুটিকয়েক নেতাকর্মীর ভিড়। বাড়ির সম্মুখে স্বল্প কয়েক পোস্টার। ৪তলা বিশিষ্ট বাড়ির পিছনে বড় একটি ফাঁকা স্থান। ওই জায়গা প্যান্ডেল পাতা, ঘুরপাক খাচ্ছে স্ট্যান্ড ফ্যান। কয়েকজন কর্মী বসে আছেন। ওখান গিয়ে জানা যায়, শালনা অঞ্চলে গণসংযোগে গেছেন তিনি।

সেখানে অপেক্ষারত সুলতানা বেগম নামে একজন বলেন, জায়েদা আপার জন্য আমরা ইলেকশনের দিন পর্যন্ত মাঠে থাকবো। আমার আপার জন্য লিফলেট নিয়ে মানুষের নিকট কাছে যাবো। আপার জন্য ভোট চাইবো। অপরজন বলেন, এলাকার নকশা সংস্কার করে দিয়েছে জাহাঙ্গীর। আজকাল আমাদের দায়িত্ব তার হয়ে কাজ করা। জাহাঙ্গীর ভাইয়ের নমিনেশন যেহেতু বাদ হয়েছে সেহেতু আমরা আজকাল তার আম্মার জন্য কাজ করবো। প্রশ্নের উত্তরে উনি বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের সহযোগী অথচ জাহাঙ্গীর ভাইয়া আমাদের আপনজন।

মুদ্রার উল্টো পিঠে জাহাঙ্গীর: গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আলোচিত নিসর্গ হয়ে উঠেছেন জাহাঙ্গীর। নির্বাচনে সরাসরি ভাবে না থাকলেও মায়ের হয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করছেন তিনি। আগের ইলেকশনে তার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন ছিল প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবার। এ ছাড়াও ইলেকশনে বিএনপি প্রার্থীর প্রতিনিধি এবং সমন্বয় করা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার তীরও তার দিকে ছিল। তা সত্ত্বেও বদলে গেছে সময়। বর্তমান এই সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর মায়ের হয়ে লড়ছেন গভর্নমেন্ট দলীয় মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে। এ ছাড়াও গাজীপুর অঞ্চলে নির্বাচনী পোস্টারে সাঁটিয়েছেন নিজের ছবিও। তার মা জায়েদা খাতুন প্রচারণায় কথা বলছেন খুবই কম। আবার ৩রা মে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)’র আলোচনাতেও অংশ নেননি তিনি। এ ছাড়াও নানারকম প্রচারণায় গিয়ে কথা বলছেন মূলত জাহাঙ্গীর।

জাহাঙ্গীরের ট্রাস্টেড পূর্বের ছাত্রলীগের কর্মী ও আধুনিক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা সাদেকুল হাসান বলেন, গেল বার নৌকা হতে মননয়ন পেয়েছিলেন তিনি। এইজন্য তার সাথে ছিলাম। মেয়র নির্বাচিত হবার পরও তার সাথে ছিলাম। ইদানিং যেহেতু আওয়ামী লীগ হতে আজমত উল্লাকে নমিনেশন দিয়েছে আমরা আজমত উল্লার সঙ্গেই কাজ করবো। এদিকে পূর্বের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যে সকল কেন্দ্রীয় নেতা জাহাঙ্গীরের জন্য গাজীপুর চষে বেড়িয়েছেন এবার তারাই লড়ছেন আজমত উল্লাহর হয়ে। ডেইলি কেন্দ্রীয় নেতারা ঢাকনা হতে গিয়ে তার পক্ষে ইলেকশন চাইছেন। দলীয় কোন্দল নিরসনে ব্যস্ত সময় লঙ্ঘন করছেন। স্থানীয় নেতারা বলছেন, একেই সম্ভবত বলে কারেন্সির অপর পিঠ।

শেয়ার করুন

Author:

Welcome to Bangla BD Network, 'Bangla BD' main target is to provide content readers of this country with fantastic content. Another mark of ours is to one day establish ourselves as one of the best media platforms in the Bengali language with good quality content on academics, technology, biography, latest, special news, politics, Bangladesh, world, business, and entertainment.

0 coment rios: